আমি পুরোনো চীনামাটির বাসনের প্রতি এক ধরনের অদ্ভুত টান অনুভব করি—যাকে মজা করে নারীদের মতো দুর্বলতা বলা যায়। কোনো বড় বাড়িতে গেলে আমি আগে চীনামাটির বাসনের আলমারি দেখতে চাই, তারপর ছবির গ্যালারি। কেন এই পছন্দের ক্রম, তার সঠিক ব্যাখ্যা আমি দিতে পারি না। শুধু এটুকু বলতে পারি, আমাদের প্রত্যেকেরই কিছু রুচি থাকে, যা এত পুরোনো যে আমরা আর স্পষ্ট করে মনে করতে পারি না, সেগুলো আদৌ কবে শেখা হয়েছিল। জীবনে প্রথম যে নাটকটি দেখেছিলাম বা প্রথম যে প্রদর্শনীতে গিয়েছিলাম, তার কথা আমার মনে আছে; কিন্তু কবে থেকে চীনা জার আর সসার আমার কল্পনার জগতে ঢুকে পড়েছিল, তা আমার মনে নেই।
ছোটবেলায় যেমন সেই ছোট ছোট নীল রঙের অদ্ভুত ছবিগুলো আমার অপছন্দ ছিল না, এখনও নেই। সেই ছবিগুলোতে মানুষ আর নারী-পুরুষ কোনো নিয়মকানুন মানে না; তারা যেন বাতাসে ভেসে বেড়ায়। সেখানে দৃষ্টিকোণ বা সীমারেখা বলে কিছু নেই। একটি চায়ের কাপই যেন হয়ে ওঠে এক অদ্ভুত কল্পনার জগৎ।
আমি আমার সেই পুরোনো বন্ধুদের দেখতে ভালোবাসি—যাদের সঙ্গে দূরত্ব কোনো দিনও দূরত্ব সৃষ্টি করতে পারেনি। দেখতে মনে হয় তারা বাতাসে ভাসছে, কিন্তু আসলে শিল্পী ভদ্রতার খাতিরে তাদের পায়ের নিচে একটু গাঢ় নীল রঙ এঁকে দিয়েছেন, যাতে বোঝা যায় তারা মাটিতেই দাঁড়িয়ে আছে। না হলে ছবিটা একেবারেই হাস্যকর হয়ে যেত।
আমি এমন পুরুষদের ভালোবাসি যাদের মুখে নারীর ছাপ আছে, আর নারীদের—যদি সম্ভব হয়—আরও বেশি নারীর মতো মুখভঙ্গি থাকলে আমার ভালো লাগে।
এখানে দেখো, এক তরুণ ও ভদ্র চীনা ম্যান্ডারিন অনেক দূর থেকে একটি থালার ওপর চা এগিয়ে দিচ্ছে এক মহিলাকে। দূরত্ব যেন এখানে সম্মান বাড়িয়ে দেয়। আবার দেখো, সেই একই মহিলা—অথবা আরেকজন, কারণ চীনা কাপের ছবিতে সবাই প্রায় একই রকম দেখতে—একটি ছোট রূপকথার নৌকায় পা দিচ্ছে। নৌকাটি নদীর এক পারে বাঁধা, অথচ তার পা পড়বে অন্য পারে, ফুলে ভরা এক মাঠে। আমাদের বাস্তব জগতে যা একেবারেই অসম্ভব, এই অদ্ভুত জগতে তা খুব স্বাভাবিক।
আরও একটু এগোলে—যদি তাদের জগতে দূর আর কাছে বলে কিছু থাকে—দেখা যায় ঘোড়া, গাছ আর প্যাগোডা যেন একসঙ্গে নাচছে। আবার কোথাও দেখা যায়, এক গরু আর এক খরগোশ পাশাপাশি শুয়ে আছে, আকারে প্রায় সমান। চীনের এই স্বচ্ছ কল্পনার জগতে এমনই সব দৃশ্য দেখা যায়।
গত সন্ধ্যায় আমি আমার কাজিন ব্রিজেটকে নিয়ে চা খাচ্ছিলাম। আমরা এখনো পুরোনো দিনের মতো বিকেলে দুধ ছাড়া চা খাই। সেই সময় আমি নতুন কেনা এক সেট পুরোনো নীল চীনা বাসনের ওপর আঁকা এই আশ্চর্য সুন্দর দৃশ্যগুলো তাকে দেখাচ্ছিলাম। আমি বলছিলাম, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমাদের অবস্থা ভালো হয়েছে বলেই আমরা এখন চোখকে আনন্দ দেওয়ার জন্য এমন ছোটখাটো সুন্দর জিনিস কিনতে পারছি। এমন সময় আমি লক্ষ করলাম, হঠাৎ ব্রিজেটের মুখে বিষণ্ণতার ছায়া পড়েছে। ব্রিজেটের এই হালকা মনখারাপ আমি সহজেই বুঝে ফেলি।
সে তখন বলল, তার খুব ইচ্ছে করে সেই ভালো পুরোনো দিনগুলো ফিরে আসুক, যখন আমরা এতটা সচ্ছল ছিলাম না। সে বলল, সে গরিব হতে চায় না, কিন্তু এমন একটা মাঝামাঝি অবস্থা ছিল, যখন আমরা অনেক বেশি সুখী ছিলাম। এখন টাকা থাকায় কোনো জিনিস কেনা মানে শুধু কেনাই। আগে কোনো সস্তা বিলাসী জিনিস কিনতে চাইলেও দু-তিন দিন ধরে আলোচনা হতো—কোথা থেকে টাকা বাঁচানো যায়, কী বাদ দেওয়া যায়। তখন কোনো জিনিস কিনলে সত্যিই মনে হতো, সেটা কেনার মতোই হয়েছে।
সে আমাকে মনে করিয়ে দিল সেই বাদামি কোটের কথা, যা আমি অনেক দিন পরেছিলাম, যত দিন না সবাই আমাকে লজ্জা দিতে শুরু করেছিল। শুধু একটি দামী পুরোনো বই কেনার জন্যই আমি ওই কোট পরতাম। কত কষ্ট করে বইটি কেনা হয়েছিল, কত আনন্দ নিয়ে আমি সেটি বাড়ি এনেছিলাম, আর সে কী যত্ন নিয়ে তার ছেঁড়া পাতাগুলো ঠিক করেছিল—এসব কথা বলতে বলতে সে জিজ্ঞেস করল, গরিব থাকার মধ্যে কি কোনো আনন্দ ছিল না? এখন আমি যত খুশি বই কিনতে পারি, কিন্তু আর সেই আনন্দ নিয়ে কিছু বাড়ি আনি না।
সে আরও বলল, আগে আমরা কত আনন্দ নিয়ে হেঁটে হেঁটে বেড়াতে যেতাম, সামান্য খাবার সঙ্গে নিয়ে। কোনো সরাইখানায় বসে সাধারণ খাবার খেতাম। এখন আমরা গাড়িতে যাই, ভালো হোটেলে খাই—কিন্তু সেই স্বাদ আর নেই। আগে সস্তা গ্যালারিতে বসে নাটক দেখার আনন্দ ছিল অসাধারণ। ভিড় আর কষ্টের মধ্যেও নাটকের প্রতি মনোযোগ ছিল গভীর। এখন দামি আসনে বসেও সেই অনুভূতি আর আসে না।
সে বলল, আগে স্ট্রবেরি বা মটরশুঁটি প্রথম খাওয়াটাই ছিল এক ধরনের উৎসব। এখন সবকিছু সহজলভ্য, তাই আর কোনো ‘ট্রিট’ নেই। তার মতে, যারা দারিদ্র্যের ঠিক ওপরে থাকে, তারাই নিজেদের জন্য ছোট আনন্দ উপভোগ করতে পারে।
সে বছরের শেষের হিসাবের কথাও বলল। আগে কত দুশ্চিন্তা হতো, তবু নতুন বছরের আশায় আনন্দ থাকত। এখন আর কোনো হিসাব নেই, কোনো উত্তেজনাও নেই।
আমি সব কথা শুনে হেসে বললাম, আমরা তখন সুখী ছিলাম ঠিকই, কিন্তু আমরা তখন তরুণও ছিলাম। দারিদ্র্য আমাদের একে অপরের সঙ্গে আরও শক্ত করে বেঁধে রেখেছিল। এখন বয়স হয়েছে, তাই স্বাচ্ছন্দ্য দরকার। যৌবনে দারিদ্র্য শক্তি দেয়, আর বার্ধক্যে স্বাচ্ছন্দ্য তার বিকল্প। তবু যদি সেই পুরোনো দিনগুলো—সস্তা গ্যালারি, ভিড়ভাট্টা, নাটকের উত্তেজনা—ফিরে আসত, তাহলে তার জন্য আমি যে কোনো সম্পদ ত্যাগ করতেও রাজি হতাম।
এই কথা বলেই আমি আবার চোখ ফেরালাম সেই চীনা বাসনের দিকে—যেখানে এক ছোট চীনা ভৃত্য একটি বিশাল ছাতা ধরে দাঁড়িয়ে আছে এক শান্ত, সুন্দরী মহিলার মাথার ওপর। যেন অতীতের সেই কল্পনার সুখ আবার আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল।