Of Studies
ফ্রান্সিস বেকন (১৬২৫)
অধ্যয়নের তিনটি প্রধান উদ্দেশ্য আছে — আনন্দ, অলংকার, এবং যোগ্যতা অর্জন। অধ্যয়নের আসল আনন্দ আমরা পাই নির্জনতা ও একাকী সময়ে; এটি মনকে শান্তি ও তৃপ্তি দেয়। আলাপ-আলোচনায় অধ্যয়ন একজন মানুষকে রুচিশীল ও আকর্ষণীয় করে তোলে, আর কাজে ও সিদ্ধান্তে এটি তাকে দক্ষ করে তোলে। দক্ষ কর্মীরা কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে ভালোভাবে কাজ করতে পারে, কিন্তু বৃহত্তর পরিকল্পনা বা পরামর্শ দিতে পারে তারা যারা শিক্ষিত ও অধ্যয়নপ্রবণ।
তবে অতিরিক্ত অধ্যয়ন আলস্য সৃষ্টি করে; যদি কেউ কেবল দেখানোর জন্য পড়াশোনা করে, তবে তা ভণ্ডামি; আর যদি কেউ বইয়ের নিয়মকানুন অনুযায়ী সব কিছু বিচার করে, তবে সে একরকম পণ্ডিতি খুঁতখুঁতে মানুষ। অধ্যয়ন প্রকৃতিকে নিখুঁত করে এবং অভিজ্ঞতা অধ্যয়নকে নিখুঁত করে তোলে। যেমন প্রাকৃতিক গাছের ডালপালা ছাঁটাই করলে তা সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠে, তেমনি মানুষের প্রাকৃতিক ক্ষমতাকেও অধ্যয়নের মাধ্যমে শোধন করতে হয়। আবার অধ্যয়নের নির্দেশনাও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সীমাবদ্ধ ও বাস্তবমুখী হতে হয়।
চতুর মানুষরা অধ্যয়নকে তুচ্ছ মনে করে, সরল মানুষরা অধ্যয়নকে শ্রদ্ধা করে, কিন্তু জ্ঞানী মানুষরা অধ্যয়নকে যথাযথভাবে কাজে লাগায়। কারণ অধ্যয়ন নিজে থেকেই তার ব্যবহার শেখায় না; সেটি শেখা যায় অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে।
পড়া উচিত না শুধু বিরোধিতা করার জন্য, না অন্ধভাবে বিশ্বাস করার জন্য, না শুধু কথাবার্তার বিষয় খুঁজে পাওয়ার জন্য — বরং পড়া উচিত গভীরভাবে ভাবা ও বিচার করার জন্য।
সব বই একভাবে পড়ার নয়। কিছু বই শুধু স্বাদ নেওয়ার মতো, কিছু বই পুরো পড়া যায় কিন্তু খুব গভীরভাবে নয়, আর কিছু বই আছে যেগুলোকে মনোযোগ ও পরিশ্রম সহকারে পুরো পড়া উচিত। কিছু বই অন্যের দ্বারা সংক্ষেপে পড়ে নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু সেগুলো অবশ্যই তুচ্ছ বা কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হওয়া উচিত। নইলে এমন সংক্ষিপ্ত বই হবে পাতলা জলমিশ্রিত পানির মতো — চটজলদি কিন্তু গুণহীন।
পড়া মানুষকে পূর্ণ করে, আলোচনা মানুষকে তৎপর করে, আর লেখা মানুষকে নিখুঁত করে তোলে। তাই, যে কম লেখে, তার ভালো স্মৃতি থাকা দরকার; যে কম আলোচনা করে, তার দ্রুত বুদ্ধি থাকা দরকার; আর যে কম পড়ে, তার যথেষ্ট চতুরতা থাকা দরকার যাতে সে অজানাকে জানা বলে দেখাতে পারে।
ইতিহাস পড়া মানুষকে জ্ঞানী করে; কবিতা পড়া মানুষকে বুদ্ধিদীপ্ত ও কল্পনাশক্তিসম্পন্ন করে; গণিত মানুষকে সূক্ষ্মবোধী করে; প্রকৃতিবিজ্ঞান মানুষকে গভীর করে; নীতিবিদ্যা মানুষকে গম্ভীর করে; আর যুক্তিবিদ্যা ও অলঙ্কারশাস্ত্র মানুষকে বিতর্কে পারদর্শী করে তোলে। “Abeunt studia in mores” — অর্থাৎ, অধ্যয়ন মানুষের চরিত্র ও আচরণে প্রভাব ফেলে।
না, মানুষের বুদ্ধি বা মননশক্তিতে কোনো বাধা বা অবসান নেই, যা যথাযথ অধ্যয়নের মাধ্যমে ঠিক করা যায়; যেমন শরীরের রোগের জন্য উপযুক্ত ব্যায়াম থাকে, তেমনই মনের দুর্বলতাও নির্দিষ্ট অধ্যয়নের মাধ্যমে শক্তিশালী করা যায়। (বেকন বলেন, যেমন শরীরের প্রতিটি রোগের নির্দিষ্ট ব্যায়াম আছে, তেমনি মনের প্রতিটি ত্রুটিরও নির্দিষ্ট অধ্যয়ন রয়েছে যা তা সংশোধন করতে পারে। ) যেমন, বল করা পাথর বা বৃক্কের জন্য উপকারী; বন্ধুক চালানো ফুসফুস ও বুকের জন্য; ধীর হেঁটে চলা পেটের জন্য; ঘোড়া চালানো মাথার জন্য; এবং এভাবে অন্য অন্য মননশক্তির দুর্বলতাও নির্দিষ্ট অনুশীলন দ্বারা সমাধান করা যায়।”
কারো মন যদি অস্থির ও চঞ্চল হয়, তাকে গণিত অধ্যয়ন করা উচিত, কারণ গণিতের প্রমাণে মন সামান্যও সরে গেলে আবার শুরু করতে হয়; এতে মনোযোগ বৃদ্ধি পায়।
কারো যদি পার্থক্য নির্ণয়ের ক্ষমতা না থাকে, তাকে ( মধ্যযুগীয়) দার্শনিক “Schoolmen”-দের লেখা পড়তে হবে, কারণ তারা সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করে।
কারো যদি যুক্তি সাজানোর ক্ষমতা কম হয়, তাকে আইনবিদদের মামলা অধ্যয়ন করতে হবে, কারণ এতে এক বিষয়ে থেকে অন্য বিষয়ে যুক্তি টেনে আনতে শেখা যায়।
সুতরাং, মনের প্রতিটি দুর্বলতার জন্য উপযুক্ত অধ্যয়নের “ওষুধ” আছে।
মূল ভাবসংক্ষেপ
ফ্রান্সিস বেকন এই প্রবন্ধে অধ্যয়নের প্রকৃত মূল্য ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, অধ্যয়ন শুধু জ্ঞান অর্জনের জন্য নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বুদ্ধি, বিচার, এবং মানবিক গুণ বিকাশের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু অতিরিক্ত বা প্রদর্শনমূলক অধ্যয়ন যেমন ক্ষতিকর, তেমনি অভিজ্ঞতাবিহীন জ্ঞানও অসম্পূর্ণ। সত্যিকার জ্ঞানী মানুষ সে, যে অধ্যয়নকে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে ব্যবহার করতে জানে।